বরেন্দ্রে বিলুপ্তি ধানের বীজ সংরক্ষক কৃষক ইউসুফ মোল্লা আর নেই

বরেন্দ্র অঞ্চল প্রতিবেদক
বরেন্দ্রর কৃতি সন্তান কয়েকশ প্রজাতির বিলুপ্ত ধান সংরক্ষক, জাতীয় পরিবেশ স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত আদর্শ কৃষক, তানোর নদী রক্ষা কমিটির আহবায়ক কৃষক ইউসুফ মোল্লা (৮০) আর নেই…..। শুক্রবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে নিজ বাসভবন তানোর উপজেলার দুবইল গ্রামে ইন্তিকাল করেছেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন)।

তিনি দীর্ঘদিন ধরে নানা রোগে ভুগছিলেন। তিনি এক ছেলে দুই মেয়ে, নাতি-নাতনী, আত্মীয়স্বজনসহ অনেক গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। মহুরমের জানাজা শুক্রবার বিকাল ৪টায় দুবইল হাইস্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে পারিবারিক গোরস্তানে দাফন করা হয়।

কৃষক ইউসুফ মোল্লার জানাজায় উপজেলা কৃষি বিভাগ, বরেন্দ্র বহুমুখি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমড়িএ) কর্মকর্তা, পৌর মেয়র, ইউপি চেয়ারম্যানসহ কয়েক হাজার কৃষক উপস্থিত ছিলেন। তার এমন মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে উপজেলাজুড়ে।

কৃষক ইউসুফ মোল্লার সংক্ষিপ্ত জীবনী : যুবরাজ, সাদাকথা, রাঁধুনি পাগল, পাঙ্গাস, ঝিঙ্গাশাইল, কালজিরা, সুবাশ, বাঁশমতি, চিনি শঙ্কর, বাদশাভোগ, এক ধানে দুই চাল, বিন্নি। এসব ধানের নাম এখন আর অনেকের মনে নেই। নতুন প্রজন্ম তো দূরের কথা প্রবীনদের অনেকের মনের পাতা থেকে হারিয়ে গেছে নামগুলো।

তবে এসব ধান অনেক যত্নে আগলে রেখেছেন কৃষক ইউসুফ মোল্লা। গত ২০ বছর ধরে বীজের পরিধি বাড়াতে ৫২ জাতের ধান চাষাবাদ করেছিলেন। চলতি মৌসুমে সে গতি বেড়ে তিনি চাষাবাদ করেছেন ৭২ জাতের ধান চাষ।
রাজশাহীর তানোর উপজেলার দুবইল গ্রামের বাসিন্দা তিনি। এত ধরনের জাতের ধান একসঙ্গে চাষাবাদ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে কৃষক পর্যায়ে ইউসুফ মোল্লাই প্রথম স্থানে আছেন বলে দাবি কৃষি কর্মকর্তাদের।

কৃষক ইউসুফ মোল্লার ব্যাক্তি উদ্যোগে এসব বিলুপ্ত ধানের বীজ দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষরণ করে রাখতেন। ২০১২ সাল থেকে রাজশাহী, বগুড়া, দিনাজপুরসহ সারাদেশে প্রায় ৩০০ কৃষককে তিনি এসব বীজ শর্তসাপেক্ষে সবরাহ করেছেন। এছাড়া ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ঢাকায় ১০০ এর বেশি ও রাজশাহী গবেষণাগারে প্রায় ৬৫ জাতের ধান বীজ সরবরাহ করেছেন।

ইউসুফ মোল্লা আদর্শ কৃষক। আদর্শ কৃষক হিসেবে অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন তিনি। তার প্রচেষ্টায় বিলুপ্তি প্রায় ২০০ বেশি ধানের বীজ সংরক্ষেণে আছে। ইউসুফ মোল্লা পরিবেশবান্ধব সুগন্ধি এসব ধান অল্পদিনেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থেকে হারিয়ে যাচ্ছে বুঝতে পেরেই তিনি গত বিশ বছর ধরে বীজ সংগ্রহের কাজ করতেন। এখন পর্যন্ত ৪০০ বেশি বিভিন্ন জাতের ধান বীজ তিনি সংগ্রহ করেছেন। ২০১২ সাল থেকে ৫০টি করে জাতের ধান তিনি অল্প করে আবাদ করেন। সে সঙ্গে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগ্রহী কৃষকদের মাঝে বিতরণ করেন।

কৃষক ইউসুফ মোল্লার সংগ্রহে থাকা ১০০ প্রজাতির বেশি বীজ গাজীপুর ধান গবেষণা কেন্দ্র ও রাজশাহী ধান গবেষণা কেন্দ্রে ৬৫ রকম বীজ দেয়া হয়েছে। চট্টগ্রামে ৭২ ঝিনাইদহ ১২ প্রকার জাতের ধান সরবরাহ করেছেন। তারা সেগুলোর বিস্তার করা নিয়ে গবেষণা করছে।

তানোর উপজেলা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা শমসের আলী বলেন, কৃষক ইউসুফ মোল্লার ৩০ বছরের প্রচেষ্টায় বরেন্দ্র থেকে অনেক নামিদামি বিলুপ্তি ধানগুলো নতুন করে জীবন পেয়েছে। সে সাথে দেশের মধ্যে তানোর উপজেলার কৃষক হিসাবে ইউসুফ মোল্লা রাজশাহী তথা বরেন্দ্র অঞ্চলের সুনাম ধরে রাখেন। তাছাড়াও বিলুপ্তি ধান সর্ম্পকে নতুন প্রজন্ম জানতে পারছিল। তার মৃত্যুতে বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষকরা একটি সম্পদ হারাল।